রোদটা সবেমাত্র বুড়িগঙ্গার ওপারে ম্লান হয়ে হারিয়ে গেছে। আসমানের গায়ে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত গোধূলির আভা—কমলা, তামাটে আর ছাইরঙের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। ঠিক এই সময়টায় পুরান ঢাকার রূপ বদলাতে শুরু করে। ব্যস্ত অলিগলিগুলো যেন একটু জিরিয়ে নিতে চায়, আর ঠিক তখনই জেগে ওঠে এই প্রাচীন শহরের আসল প্রাণ—চা-এর স্টল আর আড্ডা।
চকবাজারের ঠিক পেছনের একটি সরু গলি। দু'পাশে শতবর্ষী পুরনো সব দালান, যেগুলোর গায়ে জমে আছে ইতিহাসের ধুলো। ঠিক এই গলির মোড়েই বখতিয়ার চাচার চায়ের দোকান। টিনের চাল, একটা নড়বড়ে কাঠের বেঞ্চ, আর চুলার লালচে আগুনে হাড়ভাঙা ক্লান্তির মাঝেও জ্বলজ্বল করছে এক টুকরো উষ্ণতা।
গোধূলির আলোয় পুরান ঢাকার চঞ্চলতা
সন্ধ্যা নামতেই গলিতে ভিড় বাড়তে শুরু করে। রিকশার জট, হকারদের গলা ফাটানো ডাক, আর ভাজাভজির সুবাস বাতাসে এক মোহনীয় পরিবেশ তৈরি করে। বখতিয়ার চাচার চুলার ওপর বড় কেটলিটা সাঁই সাঁই করে বাষ্প ছাড়ছে। তার পাশেই ছোট ছোট কাচের গ্লাস সাজানো।
এই দোকানের নিয়মিত মুখগুলো একে একে হাজির হতে শুরু করেছে। গলির মাথায় বসা মুরুব্বি রহমান ভাই, যিনি বিগত চল্লিশ বছর ধরে এই এলাকার তসবিহ আর আতরের ব্যবসা করেন; পাশে বসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ ছাত্র তানভীর, যে সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হয়ে পুরান ঢাকার প্রেমে পড়ে গেছে; আর আছে এলাকার চঞ্চল যুবক পিন্টু।
এক কাপ চা আর হাজারো গল্পের শুরু
"চা দাও তো চাচা, একটু কড়া লিকার দিয়ে!"—গলার স্বর চড়িয়ে বসেন রহমান ভাই।
বখতিয়ার চাচা মিষ্টি হেসে কেটলি থেকে ফ্লাস্কে দুধ ঢালতে ঢালতে বলেন, "আরে রহমান ভাই, আপনার চা তো এই চুলার ওপরেই রেডি থাকে। এই নাও, স্পেশাল মাললাই চা!"
কাচের গ্লাসে যখন ধোঁয়া ওঠা চা এসে পৌঁছায়, তখন তাতে চুমুক দেওয়ার অনুভূতিটাই আলাদা। প্রথম চুমুকেই আদার ঝাঁজ আর এলাচের সুবাস মন চঞ্চল করে তোলে। এই এক কাপ চা যেন কেবল একটি পানীয় নয়, বরং সারাদিনের ক্লান্তি মুছে ফেলার জাদুকরী দাওয়াই।
তানভীর তার চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে চারপাশের পুরনো দালানগুলোর দিকে তাকায়। সে মুগ্ধ হয়ে বলে, "জানেন রহমান ভাই, এখানকার এই বাড়িগুলোর ইট-কাঠের মধ্যেও যেন একটা জীবন্ত ইতিহাস লুকিয়ে আছে। প্রতিদিন সন্ধ্যার এই সময়টা আমার কাছে মনে হয় একটা টাইম মেশিনে চড়ে অতীতে ফিরে যাওয়ার মতো।"
রহমান ভাই মুচকি হাসেন। নিজের দাড়িে হাত বুলিয়ে বলেন, "বাবা তানভীর, এই পুরান ঢাকা শুধু ইট-কাঠের শহর না। এটা হলো নাড়ির টানের জায়গা। এই গলির প্রতিটা ধূলিকণায় আমাদের বাপ-দাদার ঘাম মিশে আছে। এখানকার রাজনীতি, এখানকার প্রেম, এখানকার ভাঙা-গড়া—সবকিছুর সাক্ষী এই চায়ের কাপ। বিশ বছর আগে যখন তোমার মতো তরুণ ছিলাম, এই স্টলেই আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিতাম। আজ তোমরা বসো, শুধু মানুষগুলো বদলেছে, আড্ডার সুরটা একই রয়ে গেছে।"
আড্ডার রঙে মিশে থাকা সুখ-দুঃখ
আড্ডা এবার জমে ওঠে। চা চক্রে একে একে যোগ দেয় গলির মুদি দোকানদার কাশেম মিয়া, একটু দূরে সেলাইয়ের কাজ করা রফিক ভাই। কথার ফুলঝুরি ছুটতে থাকে। সমসাময়িক খবরের পাশাপাশি উঠে আসে পুরনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বাকরখানি, বকশীবাজারের বিখ্যাত বিরিয়ানি আর ঐতিহ্যবাহী শবে বরাতের হালুয়ার গল্প।
সন্ধ্যা গড়াতে থাকে রাতের দিকে। মাথার ওপর ঝুলন্ত হলুদ ল্যাম্পপোস্টের আলোয় চায়ের স্টলের চারপাশের ধোঁয়া যেন আরও মায়াবী হয়ে ওঠে। পিন্টু তার পকেট থেকে একটা মোবাইল বের করে একটা রিলস বানানোর চেষ্টা করতেই রহমান ভাই হেসে উঠেন, "আরে মিয়া, এই জমানার জিনিস বাদ দাও! চা খাও, মন জুড়াও। ঢাকার আড্ডা কি আর মোবাইলে ধরা যায়?"
সবাই সমস্বরে হেসে ওঠে। হাসির শব্দে যেন চারপাশের পুরনো দেওয়ালগুলোও কেঁপে ওঠে।
ভালোবাসার এক চিরায়ত বন্ধন
রাত গভীর হতে শুরু করে। একে একে দোকানপাট বন্ধ হতে থাকে। বখতিয়ার চাচা এবার চুলার আগুন নিভিয়ে দিতে শুরু করেন। আজকের মতো কেটলির পানি ফুরিয়েছে, আড্ডার রেখাও আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে আসছে।
সবাই যখন যার যার ঘরের দিকে পা বাড়ায়, তানভীর শেষবারের মতো পেছন ফিরে চায়ের স্টলটার দিকে তাকায়। তার মনে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি কাজ করে। সে বুঝতে পারে, এই ঢাকা শহর যতই আধুনিক হোক না কেন, এর আসল আত্মা লুকিয়ে আছে এই সাধারণ মানুষগুলোর হৃদয়ে, গোধূলির আলোয় আর বখতিয়ার চাচার ওই এক কাপ ধোঁয়া ওঠা লিকার চায়ে।
পুরান ঢাকার সন্ধ্যা মানেই এক টুকরো নস্টালজিয়া, যেখানে প্রতি কাপ চায়ে লেখা হয় এক একটি নতুন শহরের গল্প।

