ফাল্গুনের আকাশটা সকাল থেকেই ভার ছিল। বিকেলের দিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বইমেলায় যখন অনিক আর তনিমা ঢুকলো, তখনো মেঘের গুড়গুড় ডাক শোনা যাচ্ছিল। অনিক তনিমাকে বলেছিল, "আজ না গেলেই হতো, যা আবহাওয়া!" কিন্তু তনিমার এক কথা, "বৃষ্টির দিনের বইমেলার মজাই আলাদা।"

মেলায় তখনো বেশ ভিড়। স্টলগুলোর সামনে মানুষের জটলা। তনিমা একটা লিটল ম্যাগাজিনের স্টলে হুমড়ি খেয়ে পড়লো, আর অনিক একটু দূরে দাঁড়িয়ে মেলার জনস্রোত দেখছিল। হঠাৎ কোনো আগাম বার্তা ছাড়াই ঝমঝমিয়ে নামলো বৃষ্টি।

বিজ্ঞাপন · inarticle_1

মুহূর্তের মধ্যে মেলার চিত্র বদলে গেল। পাঠক, দর্শনার্থী সবাই দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটতে লাগলো আশ্রয়ের খোঁজে। স্টলের কর্মীরা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন বই প্লাস্টিক দিয়ে ঢাকতে। অনিক আর তনিমা দৌড়ে গিয়ে একটা বড় প্রকাশনীর স্টলের টিনের চালের নিচে আশ্রয় নিলো। তাদের মতো আরও অনেকেই সেখানে ভিড় করেছেন।

বাইরে তখন অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কাঁচা রাস্তা নিমেষেই কর্দমাক্ত হয়ে উঠলো। টিনের চালে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ, আর মাটির সোঁদা গন্ধ মিলেমিশে এক অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ তৈরি হলো। মেলার রঙিন আলো আছড়ে পড়ছিল বৃষ্টির ধারার ওপর।

তনিমা ব্যাগের ভেতর থেকে মেলা থেকে সদ্য কেনা একটা বই বের করলো। বৃষ্টির ছাঁট থেকে বইটিকে বাঁচাতে বাঁচাতে সে অনিককে বললো, "দেখো, বৃষ্টির শব্দের সাথে নতুন বইয়ের পাতার গন্ধটা কেমন মিলে গেছে!"

অনিকের বিরক্তি ততক্ষণে কেটে গেছে। সে দেখলো, বৃষ্টির কারণে মেলা থামেনি, বরং এক নতুন রূপ পেয়েছে। স্টলের ভেতরে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে থাকা অচেনা মানুষগুলোর মধ্যে এক ধরণের আন্তরিকতা তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ ভিজতে ভিজতেই মেলা থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন, তাদের হাতে ধরা পলিথিনে মোড়ানো বইয়ের প্যাকেট।

ঘণ্টাখানেক পর বৃষ্টি থামলো। ধোয়া মোছা গাছপালা আর ভেজা মেলাপ্রাঙ্গণ তখন আরও সতেজ। অনিক আর তনিমা স্টল থেকে বেরিয়ে কর্দমাক্ত পথে সাবধানে হাঁটতে শুরু করলো। বৃষ্টির দিনের এই বইমেলা তাদের স্মৃতিতে এক চিলতে ভেজা ভালোবাসার মতো রয়ে গেল।