বিএডিসির সিড ক্লিনিং মেশিন কেনায় অনিয়মের অভিযোগ, ৮ টনের বদলে ২ টন সক্ষমতার মেশিন সরবরাহের দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
প্রকাশিত: ০৭:০৬, ৯ অক্টোবর ২০২৬
কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) একটি প্রকল্পে সিড ক্লিনিং মেশিন কেনাকে কেন্দ্র করে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দরপত্রে প্রতি ঘণ্টায় ৭ থেকে ৮ টন বীজ পরিষ্কারের সক্ষমতাসম্পন্ন মেশিন কেনার শর্ত থাকলেও বাস্তবে প্রতি ঘণ্টায় মাত্র ২ টন সক্ষমতার মেশিন সরবরাহ করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারী। এ ঘটনায় প্রকল্পের ক্রয়প্রক্রিয়া, দরপত্রের শর্ত প্রতিপালন এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দরপত্রের শর্ত ও মেশিনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগকারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট দরপত্রে প্রতি ঘণ্টায় ৭ থেকে ৮ টন বীজ পরিষ্কারের সক্ষমতাসম্পন্ন সিড ক্লিনিং মেশিন সরবরাহের শর্ত ছিল। কিন্তু সরবরাহ করা মেশিনের সক্ষমতা প্রতি ঘণ্টায় মাত্র ২ টন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
দরপত্রে নির্ধারিত সক্ষমতা ও সরবরাহ করা মেশিনের প্রকৃত সক্ষমতার মধ্যে এমন অমিল থাকলে তা প্রকল্পের কার্যকারিতা এবং ক্রয়প্রক্রিয়ার যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। এ কারণে মেশিনের মডেল, প্রস্তুতকারকের কারিগরি স্পেসিফিকেশন, উৎপাদনক্ষমতা পরীক্ষার প্রতিবেদন এবং গ্রহণযোগ্যতা সনদ যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া মেশিনগুলো গ্রহণের আগে কোনো কারিগরি পরীক্ষা পরিচালিত হয়েছিল কি না, হয়ে থাকলে সেই পরীক্ষার ফলাফল কী ছিল এবং কোন মানদণ্ডে মেশিনগুলো গ্রহণ করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
প্রকল্প পরিচালক ও মূল্যায়ন কমিটির সভাপতির ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ
অভিযোগে MIEF প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ইব্রাহিম খলিল এবং টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি মাহমুদুল আলমের দায়িত্ব ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, দরপত্র মূল্যায়ন, কারিগরি যাচাই এবং সরবরাহ করা মেশিন গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। পাশাপাশি দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তিও পর্যালোচনা করা দরকার।
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, নির্ধারিত সক্ষমতার তুলনায় কম সক্ষমতার মেশিন সরবরাহের মাধ্যমে কোনো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
PETKUS ব্র্যান্ডের মেশিন নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগে জার্মানির PETKUS ব্র্যান্ডের সিড ক্লিনিং মেশিন সরবরাহের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, মেশিনের ব্র্যান্ড ও মান নিয়ে প্রচারণা থাকলেও বাস্তবে সরবরাহ করা যন্ত্রের সক্ষমতা দরপত্রের শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না, তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে মেশিনের সঠিক মডেল, প্রস্তুতকারকের দেওয়া উৎপাদনক্ষমতার বিবরণ, আমদানি ও সরবরাহসংক্রান্ত নথি এবং বাস্তব কার্যক্ষমতা পরীক্ষার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ব্র্যান্ডের নামের ভিত্তিতে কোনো যন্ত্রের উৎপাদনক্ষমতা সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
সংশ্লিষ্ট কারিগরি নথি ও পরীক্ষার ফলাফল যাচাইয়ের মাধ্যমে সরবরাহ করা মেশিন দরপত্রের শর্ত পূরণ করেছে কি না, তা নির্ধারণ করা সম্ভব।
সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগে ইসলাম এন্টারপ্রাইজ ও দীপু এন্টারপ্রাইজ নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা উল্লেখ করে তাদের দরপত্রে অংশগ্রহণ, পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং কারিগরি যোগ্যতা যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠান দুটির দরপত্রে নির্ধারিত পণ্য সরবরাহের অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ জন্য দরপত্রে জমা দেওয়া অভিজ্ঞতার সনদ, পূর্ববর্তী কার্যাদেশ, সরবরাহসংক্রান্ত নথি এবং মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদন পরীক্ষা করা যেতে পারে।
দুটি দরপত্রের নথি যাচাইয়ের দাবি
অভিযোগে সংশ্লিষ্ট দুটি দরপত্রের আইডি নম্বর যথাক্রমে ১২১৭২৮৮ ও ১১৭৯১২০ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, দরপত্র দুটির পূর্ণাঙ্গ নথি পর্যালোচনা করা হলে মেশিনের সক্ষমতা, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে দরপত্রের কারিগরি বিবরণ, মূল্যায়ন প্রতিবেদন, কার্যাদেশ, সরবরাহ করা মেশিনের মডেল, প্রস্তুতকারকের স্পেসিফিকেশন এবং গ্রহণযোগ্যতা সনদ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মেশিনের উৎপাদনক্ষমতা নির্ধারণে ব্যবহৃত পরীক্ষার পদ্ধতি ও ফলাফলও যাচাই করা দরকার।
দরপত্রে নির্ধারিত শর্তের সঙ্গে সরবরাহ করা মেশিনের প্রকৃত বৈশিষ্ট্যের অমিল পাওয়া গেলে তার কারণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় কার কী দায়িত্ব ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা সম্ভব।
সরকারি অর্থের ব্যবহার ও প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ
কৃষি খাতে সরকারি অর্থে যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষেত্রে দরপত্রের কারিগরি শর্ত, সরবরাহকারীর যোগ্যতা এবং যন্ত্রের কার্যক্ষমতা যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদনক্ষমতার মেশিন সরবরাহ করা হয়ে থাকলে তা প্রকল্পের লক্ষ্য অর্জন, কাজের দক্ষতা এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
সিড ক্লিনিং মেশিনের সক্ষমতা প্রকল্পের নির্ধারিত কাজের তুলনায় কম হলে বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণে অতিরিক্ত সময় লাগার আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে। তবে বাস্তবে প্রকল্পের উৎপাদনশীলতা বা আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করতে মেশিনের কার্যক্ষমতা, ব্যবহারসংক্রান্ত তথ্য এবং প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে শুধু মেশিনের সক্ষমতা নয়, বরং দরপত্র মূল্যায়ন, কারিগরি অনুমোদন, পণ্য পরিদর্শন এবং চূড়ান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়াও পর্যালোচনা করা জরুরি।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
অভিযোগকারী সংশ্লিষ্ট দরপত্রের পূর্ণাঙ্গ নথি যাচাই, সরবরাহ করা মেশিনের প্রকৃত উৎপাদনক্ষমতা নির্ধারণ, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগ্যতা পরীক্ষা এবং দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
তবে এসব ব্যাপারে অভিযুক্তদের বক্তব্য নেয়ার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।
এফএইচ/বিএ/পিআর