ঢাকা, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

/ বাংলাদেশ / জাতীয়

বাঁধ রক্ষায় নিজেরাই ‘দেয়াল’ গড়ছেন কয়রার মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৯:৪১, ১ অগাস্ট ২০২৫

বাঁধ রক্ষায় নিজেরাই ‘দেয়াল’ গড়ছেন কয়রার মানুষ

খুলনার কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের রত্নাঘেরি গ্রামটি শাকবাড়িয়া নদীর কোলঘেঁষে অবস্থিত। নদীর অপর পাড়ে বিস্তৃত সবুজের সমারোহে দাঁড়িয়ে আছে সুন্দরবন। প্রতিদিন জোয়ারের পানি আর নদীর ঢেউয়ের দাপটে আতঙ্কে দিন কাটে নদীপারের মানুষের। গ্রামের মানুষের প্রধান ভরসা এখন একটি কাঁচা বাঁধ, যার ওপর স্থানীয়রা নিজেরা হাতে গড়ে তুলছেন মাটির দেয়াল।

গ্রামবাসী অরবিন্দ কুমার জানান, “নদীর পানি এখন আগের মতো শান্ত নয়। সামান্য জোয়ারেই পানি বাঁধ পেরিয়ে গ্রামে ঢুকে পড়তে চায়। সেই আশঙ্কা থেকেই আমরা নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে এই দেয়াল গড়েছি।"

রত্নাঘেরির প্রায় এক কিলোমিটার বাঁধজুড়ে স্থানীয়রা স্বেচ্ছাশ্রমে নদীর চর থেকে মাটি কেটে বাঁধের ওপর মাটি সঞ্চয় করে তৈরি করছেন দেয়াল। পাথরখালী মিলনী যুব সংঘের সভাপতি অভিজিৎ মহলদার বলেন, “এই এলাকাটি নিচু হওয়ায় জোয়ারে পানি সহজেই ঢুকে পড়ে। তাই গ্রামের শতাধিক নারী-পুরুষ ও যুবক একত্রে কাজ করেছেন—কেউ মাটি তুলেছেন, কেউ বস্তায় ভরেছেন, আবার কেউ সেই মাটি দিয়েই বাঁধে নতুন দেয়াল তৈরি করেছেন।”

এই পরিস্থিতি শুধু রত্নাঘেরিতেই নয়, কয়রার বিভিন্ন জায়গা—যেমন মহেশ্বরীপুর, নয়ানি, বাবুরাবাদ, চৌকুনি, তেঁতুলতলা, মঠবাড়ি, হায়াতখালী—যেখানেই যাওয়া যায়, দেখা যায় বাঁধ রক্ষায় স্থানীয়দের তৈরি করা নতুন মাটির দেয়াল। ষাটের দশকে নির্মিত পুরোনো বাঁধগুলো এখন আর নদীর উঁচু জোয়ার ঠেকাতে পারছে না। পলি জমে নদীর তলদেশ ভরে ওঠায় পানির চাপ বেড়ে গেছে, এবং জল উপচে পড়ছে বাঁধের ওপর দিয়ে।

মহেশ্বরীপুরের বাসিন্দা অনুপম কুমার বলেন, “আগে যেখানে ৭০-৮০ হাত পানি থাকত, এখন সেখানে পলি পড়ে মাত্র ২৫-৩০ হাত পানি থাকে। এতে পানি ওপরে উঠে যায় এবং গ্রামে প্রবেশ করে। তাই বাধ্য হয়েই আমরা নিজেরা দেয়াল গড়েছি।”

শাকবাড়িয়া নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে স্থানীয় বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম জানান, “প্রতিবার জোয়ারে ভয় লাগে, কখন যে পানি ঢুকে পড়ে। আগে পানি বাঁধের মাঝামাঝি আসত, এখন পুরোটা ঢেকে ফেলে। তাই নিজেদের রক্ষায় দেয়াল তুলছি।”

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শাহনেওয়াজ শিকারী বলেন, “পাউবোকে বহুবার বলা হয়েছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। বাধ্য হয়ে মানুষ নিজেরাই কোদাল হাতে নিয়েছে।”

উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সদস্যসচিব সাইফুল ইসলাম বলেন, “নদীগুলোর স্বাভাবিক গভীরতা না থাকায় বাঁধ আর পানি সামলাতে পারে না। অন্তত ১০ ফুট উচ্চতা না বাড়ালে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।”

খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলম জানান, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলোর চিহ্নিত অংশে কাজের জন্য বাজেট চাওয়া হয়েছে। রত্নাঘেরি থেকে কাটকাটা পর্যন্ত বাঁধের উন্নয়নে ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, দ্রুতই কাজ শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে পলি অপসারণেরও পরিকল্পনা রয়েছে।

এফএইচ/বিএ/পিআর

Ad Image

সর্বোচ্চ পঠিত - জাতীয়

Ad Image

আপনার জন্য নির্বাচিত

Ad Image