অস্থিরতা আর প্রশাসনিক জটিলতায় ধস রাজস্ব প্রবৃদ্ধিতে
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:২৩, ৩১ জুলাই ২০২৫
রাজনৈতিক রদবদল, অর্থনৈতিক শ্লথগতি এবং রাজস্ব কর্তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব—এই তিনের চাপে বিদায়ী ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে রাজস্ব আদায়ের গতি প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) মাত্র ২.২৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখাতে সক্ষম হয়েছে, যা গত দুই দশকের মধ্যে অন্যতম নিম্নতম। কোভিডজনিত ব্যতিক্রমী বছরে (২০১৯–২০) ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি ছাড়া এত কম রাজস্ব বৃদ্ধির নজির আর নেই।
বিদায়ী বছরে এনবিআরের আদায় ছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা, যা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৯২ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা কম। অথচ বছরের শুরুতে তাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা, যা পরে কমিয়ে ধরা হয় ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি।
তুলনা করলে, আগের অর্থবছরে (২০২৩–২৪) এনবিআর আয় করেছিল ৩ লাখ ৬২ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকা। সেখান থেকে বাস্তব প্রবৃদ্ধি এসেছে মাত্র ৮ হাজার ৭৭ কোটি টাকা।
রাজনৈতিক অস্থিরতা: বড় ধাক্কা
২০২৪–২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধে বাংলাদেশ তীব্র রাজনৈতিক টানাপড়েনের মুখে পড়ে। কোটা সংস্কার ঘিরে ছাত্র আন্দোলন জুনের শেষ সপ্তাহে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, যা জুলাইয়ে এসে সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। আগস্টের ৫ তারিখে শেখ হাসিনার দেশত্যাগ ও সরকারের পতনের পরপরই রাজনৈতিকভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত একাধিক ব্যবসায়ী দেশত্যাগ করেন বা আত্মগোপনে চলে যান। এর ফলে দেশজ অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়, যা রাজস্ব আদায়েও সরাসরি প্রভাব ফেলে।
প্রশাসনিক গোলযোগ: এনবিআরের ভিতরে ভাঙন
এনবিআরের অভ্যন্তরে ওলট-পালট শুরু হয় অর্থবছরের শেষের দিকে। মে মাসে সরকার এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে এনবিআর বিলুপ্ত করে দুইটি নতুন ইউনিট গঠন করে: রাজস্ব নীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ। এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে এনবিআরের কর্মচারীরা ব্যাপক আন্দোলনে নামে। এমনকি চেয়ারম্যানের অপসারণের দাবিও উঠে।
রাজস্ব আদায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়—মে ও জুন—এই অস্থিরতা ও প্রতিবাদে ব্যাহত হয় কার্যক্রম। এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান নিজেও স্বীকার করেছেন যে, এতে আয় সংগ্রহে সরাসরি ব্যাঘাত ঘটেছে।
অর্থনৈতিক শ্লথগতি ও খরচে কাটছাঁট
পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজের মতে, অর্থনীতির শ্লথগতি এবং উন্নয়ন ব্যয়ে ব্যাপক ছাঁটফাঁট রাজস্ব আদায়ের নিম্নগতির প্রধান কারণ। গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে এই অর্থবছরে। পাশাপাশি, এডিপি (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি) বাস্তবায়নের হার গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল। সরকারি ব্যয় কম হওয়ায় ভ্যাট ও কর সংগ্রহেও প্রভাব পড়ে।
আরও একটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে—চাপ দিয়ে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের সংস্কৃতি। ড. রিয়াজ বলেন, “রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপে এনবিআরকে এমন লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়, যা বাস্তবে অর্জন করার মতো প্রস্তুতি তাদের থাকে না। এটা বদলানো দরকার।”
শুল্ক ছাড়, কম আমদানি, বিনিয়োগে স্থবিরতা
রাজস্ব আদায়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে শুল্ক ছাড় ও কিছু পণ্যের ওপর ট্যারিফ কমানো, যা করা হয়েছিল মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগ কমেছে, যা আমদানি কমিয়ে দিয়েছে—আর এগুলো সরাসরি প্রভাব ফেলে কাস্টমস ও ভ্যাট রাজস্ব সংগ্রহে।
এফএইচ/বিএ/পিআর